একদিন অপরাহ্নে, কৃতম্বর চৌধুরী পশ্চিমের জানালায় দাঁড়িয়ে ঢলতে যাওয়া সূর্যের রূপ দেখছিলেন। আর নিজের কথা ভাবছিলেন। কি পেলেন জীবনে! কি ছিল তার! তার কি আছে এখন! সবই তো মেকি। সবই তো ফাঁকি।
বড় সরল ছিল তার ছেলেবেলা। ঠাকুরমার কাছে শুনা কেচ্ছার মত। দুঃখ আসে, দুঃখ যায়। জীবনকে ভেবেছিলেন সকল কেচ্ছার উপসংহারের মত- “তারপরে সেই ব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্মণী সুখে দিনাতিপাত করতে লাগল।” অথবা ঠাকুরের পাঁচালীর মত- সেই থেকে সাধু ঠাকুরের কৃপায় সংসার পাতলো। তার ছেলেপুলে হলো। তার যখন বয়স বাড়লো, স্বর্গ থেকে রথ এলো। সেই রথে চড়ে সাধু স্বর্গবাসী হলো।”
কৈশোরটাও শুরু করেছিলেন অনেক স্বপ্ন দেখে। আর যখন লজ্জাবতীর পাতা মুটিয়ে যাবার মত করে প্রেম এলো মনে- কৃতম্বর তখন তারই রাইয়তের এক দরিদ্র মেয়েকে ভালোবাসলেন। জমিদারের এত আত্মীয়, আত্মীয়দের এত এত সুন্দরী কন্যা। কাউকেই তার মনে ধরলো। শেষে কি না এত অধঃপতন! কথাটি আমার নয়। কৃতম্বর চৌধুরীরও নয়। কথাটি ছিল তার জ্ঞাতি-গোত্রের। মেয়েটিও গোত্রচ্যুত ছিল না। মূল কথা ছিল এই- তার পিতার ভাণ্ডারে শ্রীলক্ষ্মী বিমুখ ছিলেন। কিন্তু মেয়ের রূপে লক্ষ্মী পঞ্চমুখ ছিলেন। ওদিকে ভাগ্যের লিখনে হয়তো ব্রহ্মদেব হাত খোলে বসেননি। তাই যা হবার হলো। কেউ কিছু জানলো না। কেউ দেখলো না। একদিন সকালে সবাই দেখলো, দরিদ্র নিরঞ্জন দেশান্তরে চলে গেছেন। যৌক্তিক কাহিনীরও অভাব হলো না। মহাজন দয়ালহরি নামে দয়াল হলেও কাজে-কর্তব্যে দয়াল নয়, সে-ই কাহিনী পাতলো। তার কাছে নিরঞ্জন কর্জ করেছিল। দিতে না পেরে মেয়ে নিয়ে পালিয়েছে। জটিল পৃথিবীর বুদ্ধি হবার পরে কৃতম্বর জেনেছিলেন, কলকাঠি নাড়া হয়েছিল তারই পরিবার থেকে। ততদিনে শ্রীমতিকে ভুলতে না পারলেও তার ঘরে তারই অর্ধাঙ্গিনী হয়ে আরেক শ্রীমতি এসে গিয়েছিলেন।
সংসারে সুখ কৃতম্বরের কপালে ছিল না। যেমনটি ভেবেছিলেন, সকল মেয়েই বুঝি প্রেমের কলসী বুকে নিয়ে বসে থাকে, তা দিনান্তে ভুল প্রমানিত হয়েছিল। পত্নী সুলোচনার চোখ দু’টি নামের মতই সুন্দর হলেও সেই চোখে কেন জানি তার মনের মত করে প্রেম ছিল না। ছিল রত্ন-অলংকারের লোভ, ধন আর মুদ্রার লোভ। ওদিকে কৃতম্বর তো স্বয়ং শ্মশানচারী মহাদেব। সতীর মত কেউ না হলে কে আর তাকে ভালোবাসবে। আর স্ত্রী যদি হয় ঠিক দক্ষরাজার মনোনুকূল, তাহলে তো গেলই। আমের সাথে আম গাছ। মনে মনে বিচ্ছেদ চূড়ান্ত করে যেদিন সুলোচনাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো, সেদিন সুলোচনার যাবার পথে কারও দৃষ্টি অপলক স্থির হয়ে থাকলে- সে ছিল কৃতম্বরের। অদূরের জলঘাটে পালকি থেকে নেমে নৌকা করে সুলোচনার বিচ্ছেদ তার মনে জলধারা জাগিয়ে ছিল। দালানের শিরে দাঁড়িয়ে যে দৃষ্টি স্রোতিনীর জলে ভাসা নৌকায় নিবদ্ধ ছিল, সে কৃতম্বরেরই ছিল।
ছয়মাস হয়ে গেল তারপর। নিজেকে নিজে প্রবোধ দিতে দিতে প্রবোধের জল যখন কলসীর তলায় এসে দাঁড়িয়েছে, তখন আর না সইতে পেরে নায়েবকে ডাকলেন। নায়েব বাহাদুর খাঁ তার ছেলেবেলারই বন্ধু। আনুষ্ঠানিক কাজকর্মের বাইরে এখনও সেই আগেকার মনেমনে টান এখনও আছে। পুনরায় বিয়ের পরামর্শকে অনেক আগেই বাড়িছাড়া করেছেন কৃতম্বর। এখন আর কোন উপায় না দেখে, নায়েব বললেন- চলুন আজকে আপনাকে নাচবাড়ির দিকে নিয়ে যাব। পশ্চিম থেকে নতুন বাঈজী এসেছে। খুব নাম-ডাক তার। আপনার মনটাও ভাল হবে। আপনি চাইলে, তাদেরকে মহলে মাঝে মাঝে আসতে বলবো।
বাহাদুর খাঁ সেদিন জানতেন না, যে ক্ষণিকের শুরু তিনি করেছিলেন তার শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
পর্দা ঠেলে আসরে ঢুকতেই বড়বাঈ সুলতানা বিবি সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন। সেখানে আগে থেকে বসা ছিল অনেকেই, ধনে-দৌলতে যাদের উদর-ফাঁপা। কৃতম্বর চৌধুরীকে দেখে তারা একটু ইতস্তত বোধ করল। বড়বাঈ উপযুক্ত আসনে বসতে নতমস্তক আবদার করলেন। কৃতম্বর বসলেন, তার পেছনে বসলেন বাহাদুর খাঁ। সুরাহি আসলো। পাত্রে মদিরা ঢেলে দেওয়া হল।
ক্ষণিক পরে এসে আসরকে প্রণতি জানিয়ে যিনি গীত ধরলেন, তার নাম আঙ্গুরী বিবি। পশ্চিম থেকে এসেছেন। তার গীতের কথাতেই বড় বেশি ভাল লেগে গেল কৃতম্বরের। কথাগুলো ছিল এমনঃ
চোখের নজরে ফেললে কড়ি
বিকিয়ে গেলাম- হায় গো নাগর
তোমারই হলাম রসিক চাঁদ মোর
চেয়ে তো দেখো তোমার নাগড়িও গো হায় হায় রে সখী
গুমড়া মুখে নাগর তো দেখি
বুঝে না হায় নজরে প্রেম
নাগর যে বড় হলো আনাড়িরসিক আমার বুঝে না
বুঝে না- হায় গো
কৃতম্বর সত্যি সত্যি প্রথম গুমড়া মুখে ছিলেন। কিন্তু বাঈজীর কথাতে মুখের থমথমে ভাব উবে গেল। কবি হলে বলতো, শাওনমাসি চাঁদ যেন মেঘ ফুঁড়ে বের হলো। আর তাতেই বাঈজী আসর মাতালো। তখন আসর শুধু কৃতম্বরের। নগরের আর যারা ছিল তারা আগেই একে একে চলে গেছে। বাহাদুর খাঁ থেকেও নেই। আসর কৃতম্বরের, বাঈজী আসরে, অথবা বাঈজী কৃতম্বরের বললে- কে আর ভুল ধরবে।
মাঝরাতে যখন গান থামলো, উঠে যেতে উদ্যত হলেন কৃতম্বর। আঙ্গুরী উঠে এসে নাচের মুদ্রায় হাত বাড়িয়ে বাঁধা দিলেন। যা বললেন তা কোন ঠুমরীকেও হার মানায়। কথাতে সুর না হোক। রস তো আছে। আর পুরুষের হৃদয়ের গভীরে যদি আদি প্রেমের ছিঁটেফুঁটো থেকে থাকে, তবে সুরহীন কথাতে বসন্তের মিলন-রাগিনী খুঁজে পেতে যুগান্তরের প্রতীক্ষার প্রয়োজন হয় না। কথাগুলো ছিল এমনঃ
আসর আপনার ছিল, আমি আসরের আপন ছিলাম
আপনি আপন ছিলেন যখন সুর ছিল তাল ছিল
এখন থেমে গেল বলেই কি- আমি পর হলাম
পেয়ালা খালি হলে কি- সুরাহি তো ভরা
প্রাণ দিতে এসে- ঠেলে যাবেন মরা
রাত্রি তো সবে যৌবনে পা দিল
আঙ্গুরী কি এত ফেলনা হলাম?
আঙ্গুরীর কথা শুনে বড়বাঈজীও কথা পাড়লেন। কৃতম্বর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পেছনে তাকাতেই- বাহাদুর খাঁও স্বীকৃতি দিলেন।
সকালে যখন ঘুমঘুম ঢলুঢলু চোখে কৃতম্বর শয্যা ছেড়ে বের হতে যাবেন, তখন ত্রস্ত জেগে আঙ্গুরী বললেন-
আর কবে সাইয়াঁ দেখা হবে আবার
মীরা বানিয়ে গেলে শ্যামরায় মথুরার
কোন কথা না বলে কৃতম্বর পর্দা ঠেলে বাইরে পা বাড়ালেন। বাহাদুর খাঁ কৃতম্বরের অপেক্ষাতেই ছিলেন।
আলুথালু কেশে আলুথালু শয্যায় আঙ্গুরী বিবি তখন কৃতম্বরের চলে যাওয়া পথের পানে তাকিয়ে। তারপর, শয্যায় কৃতম্বরের গন্ধ খুঁজে- ভুবন-ভুলানো রসের হাসি দিয়ে আবার চোখ বুজলেন।



(৩টি মূল্যায়ন, গড়: ৪.৬৭ / ৫)