জলসাঘর » বায়ান্ন ব্যঞ্জন » ঋকের নদীবন্দনা
author photo

ঋকের নদীবন্দনা

প্রকৃতি তার বৈচিত্র নিয়ে স্বকীয়তায় বেঁচে থাকলে জীবজগৎ বাঁচবে। পৃথিবী বাঁচবে। আমরা বাঁচব। নয়তো বিষমভাবাপন্ন প্রকৃতির উগ্র-রুদ্ররূপের কাছে নিরয়যন্ত্রণা ভোগ করে করে মহাকালের স্রোতে হারিয়ে যাব। প্রকৃতিকে ভালবাসলে প্রকৃতি আমাদেরকে ভালবাসবে; মায়ের মমতার মত অথবা পত্নীর প্রেমের মত, সুখ-শান্তি আর নির্ভরতার আঁচল পেতে দেবে।

শিল্পায়নের নামে, সভ্যতার নামে, আমরা প্রকৃতিকে উজাড় করে যাচ্ছি। অথচ প্রাচীন জাতিদের সাহিত্যেও খুঁজে পাওয়া যায় প্রকৃতি বন্দনা। আজ ঋকবেদের দুটি সুক্তে দেখব নদীবন্দনা।
————————————————–

*****
জলপ্রবাহবতী বিপাশা ও শুতদ্রী নদীদ্বয় পর্বতের উৎস প্রদেশ থেকে সাগর সংগমে অভিলাষি হয়ে, মন্দরাবিমুক্ত ঘোটকীদ্বয়ের ন্যায় স্পর্ধা করে, গোদ্বয়ের ন্যায় শোভমালা হয়ে, বাছুর লেহনে অভিলাষি ধেনুদ্বয়ের ন্যায় বেগে গমন করছে।

হে নদীদ্বয়, ইন্দ্র তোমাদের প্রেরণ করেছেন, তোমার তাঁর প্রার্থনা রক্ষা করেছ ও রথিদ্বয়ের ন্যায় সমুদ্র অভিমুখে গমন করছ। তোমরা একযোগে প্রবাহিত হয়ে, তরঙ্গ দ্বারা বর্ধিত হয়ে, পরস্পর পরস্পরের নিকট গমন শোভা পাচ্ছ।

মা সদৃশ শুতদ্রী নদীর কাছে উপস্থিত হয়েছি, তারা উভয়ে বাছুরকে লেহনে আদর করার মত অভিলাষিনী গাভীর মত এক স্থান অভিমুখে গমন করছে।

নদীদ্বয়, আমরা এই জল দ্বারা স্ফীত হয়ে দেবকৃত স্থানের অভিমুখে গমন করছি। আমাদের গমনের উদ্যোগ নিবৃত্ত হবার নয়। কি জন্য এই বিপ্র বারবার নদীগণকে আহবান করছে?

বিশ্বামিত্র- হে জলবতী নদীদ্বয় আমার, সোম-সম্পাদক বাক্যের জন্য মুহূর্তের জন্য গমন থেকে বিরত হও। আমি কুশিকের পুত্র, আমি প্রসাদ অভিলাষে মহতী স্তুতি দ্বারা নদীকে আমার উদ্দেশ্যে আহবান করছি।

নদীদ্বয়- নদীগণের পরিবেষ্টক বৃত্রকে হনন করে বজ্রবাহু ইন্দ্র আমাদের খনন করেছিলেন। জগৎ প্রেকর সুহস্ত, দ্যুতিমান ইন্দ্র আমাদের প্রেরণ করেছেন, তাঁর আজ্ঞায় আমরা প্রভূত হয়ে গমন করছি।

বিশ্বামিত্র- ইন্দ্র যে অহিকে বিদীর্ণ করেছিলেন, তাঁর সেই বীরকর্ম সর্বদা কীর্তন করা উচিৎ। ইন্দ্র চতুরদিকে আসীন হয়ে অবরোধকারীদের বজ্র দ্বারা বধ করেছিলেন। গমনে অভিলাষী জলসমূহ আগমন করেছিল।

নদীদ্বয়- হে স্তোতা, তুমি এই যে বাক্য ঘোষনা করছ। তা বিস্মৃত হয়ো না। ভবিষ্যত যজ্ঞ দিবসে তুমি উক্ত স্তুতি রচনা করে আমাদের সেবা কর। আমরা তোমাকে নমস্কার করছি। আমাদের পুরুষের ন্যায় প্রগলভ কর না।

বিশ্বামিত্র- হে ভগিনীভূত নদীদ্বয়, আমি স্তব করছি। আমাকে শ্রবণ কর। আমি দূর দেশ থেকে রথ ও অশ্ব নিয়ে আসছি। তোমরা অবনত হও, যাতে সুখে পার হওয়া যাবে। হে নদীদ্বয়, তোমরা স্রোতের জল নিয়ে রথের চাকার অক্ষের অধোদেশে গমন কর।

নদীদ্বয়- হে স্তোতা, আমরা তোমার এইসব বাক্য শ্রবণ করলাম, তুমি দূর থেকে এসেছ, অতএব রথ ও শকটের সঙ্গে গমন কর। মাতা যেমন পুত্রকে স্তন পান করাবার জন্য এবং যুবতী যেমন মনুষ্যকে আলিঙ্গন করার জন্য অবনত হয়, তেমন আমরা তোমার জন্য অবনত হয়েছি।

বিশ্বামিত্র- হে নিদীদ্বয়, যেহেতু ভারতগণ তোমাদের পার হবে, যেহেতু পার থেকে অভিলাষী ভরতবংশীয়েরা ইন্দ্র কর্তৃক প্রেরিত ও তোমাদের কর্তৃক অনুজ্ঞাত হয়ে পার হবে, ও পার হবার উদ্যোগ করছে ও অনুমতি পাচ্ছে, অতএব আমি সর্বত্র তোমাদের স্তুতি করব। তোমরা যজ্ঞাই।

গোধন অভিলাষী ভারতগণ পার হয়ে গেলেন, বিপ্র নদীগণের স্তুতি করছেন। তোমরা অন্নকারিনী ও ধনযুক্তা হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নদী সকলকে তৃপ্ত কর এবং শীঘ্র গমন কর।

হে নদীদ্বয়, তোমাদের তরঙ্গ এমনভাবে প্রবাহিত হোক যে যুগকীল তার উপরে থাকুক, তোমরা রজ্জু স্পর্শ কর না। পাপরহিত, কল্যাণকারিনী, আনন্দনীয়া বিপাশা ও শুতদ্রী যেন এক্ষণে বর্ধিতা না হয়।

ঋকবেদ, ৩য় মণ্ডল, সুক্ত ৩৩

*****
এই সরস্বতী নদীদেবী হব্যদাতা ব্রধ্যশ্বকে বেগসম্পন্ন ও ধনমোচনকারী দিবোদাস নামক একটি পুত্র প্রদান করেছেন। তিনি নিয়ত কেবল আত্মচিন্তনকারী দানবিমুখ পাণি সংহার করেছেন। হে সরস্বতী দেবী! তোমার এ সমস্ত দান অতি মহৎ।

এই নদীস্বরূপা সরস্বতী মৃণালখননকারীর মত প্রবল ও বেগবান তরঙ্গ সহকারে পর্বতসানু সকল ভগ্ন করেছেন। আমরা রক্ষার নিমিত্ত স্তুতি ও যজ্ঞ দ্বারা উভয় কুলনাশিনী সরস্বতীর পরিচর্যা করছি।

হে সরস্বতী! তুমি দেবনিন্দুকগণকে বধ করেছ এবং সর্বব্যাপী মায়াবী বৃসয়ের পুত্রকে সঙ্ঘার করেছ। হে অন্নসম্পন্না সরস্বতী দেবী! তুমি মানবগণকে ভূমি প্রদান করেছ এবং তাদের জন্য বারি বর্ষণ করেছ।

দানশালিনী, অন্নসম্পন্না সোত্ত বর্গের রক্ষাকারিনী সরস্বতী যেন অন্ন দ্বারা সম্যকরূপে আমাদের তৃপ্তি সাধন করেন।

হে দেবী সরস্বতী! যে ব্যক্তি তোমাকে ইন্দ্রের ন্যায় স্তব করে, সে ব্যক্তি যখন ধন লাভার্থে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়, তুমি তাকে রক্ষা কর।

হে অন্নশালিনী দেবী সরস্বতী! তুমি তুমি সংগ্রামে আমাদের রক্ষা কর এবং পূষার মত আমাদের ভোগযোগ্য ধন প্রদান কর।

ভীষণ্য, হিরণ্ময় রথে আরূঢ়া শত্রিঘাতিনী সে সরস্বতী যেন আমাদের মনোহর স্তোত্র কামনা করেন।

যাঁর অপরিমিত অকুটিদীপ্ত অপ্রতিহত গতি, জলবর্ষী বেগ প্রচণ্ড শব্দ করে বিচরণ করে।

নিয়ত ভ্রমণকারী সূর্য যেরূপ দিন সকলকে আনেন, সেরূপ সে সরস্বতী যেন আমাদের সমস্ত শত্রুকে পরাজিত করেন। এবং সলিলজয়ী অন্যান্য বাঘিনীগণকে আমাদের কাছে আনেন।

সপ্ত নিদীরূপ সপ্ত ভগিনী সম্পন্ন প্রাচীন ঋষিগণ কর্তৃক সম্যকরূপে সেবিতা, আমাদের প্রিয়তমা সরস্বতী দেবী যেন নিয়ত আমাদের স্তুতিভাজন হোন।

পৃথিবী, স্বর্গের বিস্তীর্ণ প্রদেশ সকলকে যিনি নিজ দীপ্তি দ্বারা পূর্ণ করেছেন, সে সরস্বতী দেবী যেন নিন্দুক হতে আমাদের রক্ষা করেন।

ত্রিলোকব্যাপিনী, সপ্তারথবা পঞ্চঙেণীর সমৃদ্ধবিধায়িনী সরস্বতী দেবী যেন প্রতি যুদ্ধে লোকের আহবানযোগ্য হোন।

যিনি মাহাত্ম্য ও কীর্তিদ্বারা এদের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ, যিনি নদীসমূহের মধ্যে সমাধিক বেগবতী, শ্রেষ্ঠিতা হেতু নিরতিশয় মুণশালিনী হয়েছেন, সে সরস্বতী জ্ঞানী স্তোতার স্তুতিভাজন হোন।

হে সরস্বতী! তুমি আমাদের প্রশস্ত ধন দিয়ে যাও।তুমি আমাদের হীন করো না। অদিক জল দ্বারা আমাদের উৎপীড়িত কর না। তুমি আমাদের বন্ধুত্ব ও গৃহ স্বীকার কর। আমরা যেন তোমার কাছ থেকে অপকৃষ্ট স্থান গমন না করি।

ঋকবেদ, ৬ষ্ঠ মণ্ডল, সুক্ত ৬১

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে আগে লগইন করুন।

জলসাঘরে স্বাগতম!

প্রবেশ পথ

কুঞ্চিকা হারিয়েছে?

সদস্যপদের জন্য

কৃপা করে সারথির কাছে বার্তা প্রেরণ করুন: [email protected]