আপনি মারা গেছেন। আপনার অতি নিকটাত্মীয় যারা তারা কাঁদবে। আপনার মা, স্ত্রী, কন্যা, বোন- পাড়া কাঁপিয়ে কাঁদবেন। সেই রোদনের রব আশেপাশে ছড়াবে। যে শুনবে সে ব্যথিত হবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। মৃত আপনাকে নিয়ে মন্তব্য করবে।
কিন্তু ভেবে দেখুনঃ (মরে গেলে তো আর ভাবতে পারবেন না। জীবন্মৃত হয়ে ভেবে দেখুন।)
আপনার শব ঘরে শায়িত। পুরুষরা তো আর কাঁদে না। তাই আপনার পুরুষ সজ্জন যারা তারা কাঁদছে না। নারী সজ্জন যারা তারা কাঁদছে, অন্দরমহলে, আপনার শব ঘিরে। ওদিকে আপনার বাড়ির উঠানে গানের দলের মত একদল নারী বসে আছে। তারা সুর করে আকাশ-পাতাল মাতিয়ে আপনার মৃত্যুতে কাঁদছে।
তাহলে কি অবাক হবেন? অন্যরা কি অবাক হবে?
হ্যাঁ, আমাদের সমাজে অবাক হবারই কথা। কিন্তু কোন কোন সমাজে তা হবে স্বাভাবিক। এই বিষয়টি না হলেই হবে অস্বাভাবিক।
গান করে যেসব নারী তাদের গানওয়ালী বলা হত (গায়িকা অনেক সুশীল শব্দ, বলা চলে আধুনিক বা সাধুশিষ্ট শব্দ), যারা নাচত তাদের নাচনেওয়ালী বা নটি বা নর্তকী, যারা বেশ্যা তাদেরকে বলা হত নগরবধূ বা নাগরী। আর যারা রোদন করে তাদের বলা হত রুদালী/রোদালী।
উত্তর ভারতে- বিশেষ করে রাজস্থানে এই বিশেষ জাতির নারীদের সাক্ষাত মেলত। এখন আছে কি না সঠিক ধারণা নেই। হয়তো আছে, বাংলাদেশের বেদে সমাজের মত এরাও হয়তো প্রাচীন পেশা ছেড়ে দিয়েছে। অথবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও হয়তো এদের রোদন ব্যবসা চলে। আট-দশ বছর আগে এক টেলিভিশন রিপোর্টে দেখেছিলাম, ঐ অঞ্চলের কোন এক স্থানে পানীয় জলের অভাবে মেয়েরা আট-দশ মেইল দূর থেকে পানি নিয়ে আসে, প্রলয়ংকরী খরায় ফসল নেই- তাই শুকনো ঘাস সেদ্ধ করে মানুষ খেয়ে বেঁচে থাকে।
রোদালীরা সমাজের অত্যন্ত নিম্নবর্ণের নারী (তাদের সমাজের মূল্যায়ন অনুসারে)। সমাজের ভূ-স্বামী, ধনী বা দণ্ডধর কারও মৃত্যু হলে তারা নিমন্ত্রণ পেত। তারা বাইরে সমবেত হয়ে রোদন করত, মৃত্যুশোকের বহিঃপ্রকাশ করত সামাজিকভাবে। অন্দরমহলের নারীরা সামাজিক মূল্যবোধে জোরে জোরে কাঁদতে পারত না। তাদের কান্নাটাই রোদালীরা কাঁদত। বিয়েতে যেমন সানাইয়ের সুর অন্যরকম পরিবেশের সৃষ্টি করে। মৃত্যুতে রোদালীদের রোদনও অন্যরকম এক পরিবেশের সৃষ্টি করত। যেহেতু পেশা বলে কথা, সেখানে অবশ্যই শিল্পগুণ সমৃদ্ধ ছিল রোদন, মানে রোদনের সুর হিয়া কাঁপিয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত করে দেবার মত।
রোদালী নামটা শোনা ছিল। তবে বিস্তারিত জানতাম না। বিস্তারিত জানার আগে একটি কমার্শিয়াল এডেও দেখেছিলাম এদের। পরে ব্লগার প্রতীপের মাধ্যমে এদের নামটা জানতে পারি।
সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর লেখা একটি ছোট গল্প অনুসারে ‘রোদালী’ নামে একটি ছায়াছবি নির্মিত হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। ছায়াছবিটি দেখা হয়নি।
রোদন শব্দের সাথে আরেকটি শব্দের মিল আছে, মাতম। মাতম, মাতম গাওয়া, মাইয়তের মাইয়ুছিতে মাতম ইত্যাদি কথাবার্তা পারস্য বা পারস্য প্রভাবিত শায়েরী বা গজলে দেখা যায়। বাংলা ভাষায় আছে- প্রলাপ, বিলাপ; ‘বুলবুলি নিরব নার্গিস বনে ঝরা বন গোলাপের বিলাপ শুনে’।
সাহিত্যে উপস্থিতি আছে, কিন্তু আগেকার সমাজে, পারস্যে অথবা বঙ্গদেশে, রোদালী পেশার উপস্থিতি কোথাও ছিল কি না জানা নেই। এই যেমন, একদা বাঈজী রাখা, নাচ দেখা, গান শোনা- সংগীত অনুরাগ ছাড়াও ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

————————–



