author photo

একদা

উৎসর্গঃ এস মাহবুব

যৌথ পরিবারের সুখেই তার দিনাতিপাত ছিল। মা, ভাই-বোন, বৌদি, কাকা-কাকী সব মিলে হৈ-হুল্লোড়, উল্লাস্‌ আর কখনও-সখনও পারিবারিক উচ্চবাচ্যের কমতি ছিল না। খেতে বসলে তার পাতে মাছের বড় টুকরোগুলো আসত। সে- এক নয়, দুই নয়, এক এক করে অনেকবারই পাতে তুলত। খাবার কম পড়লে গোস্বা করত। মস্করার সম্বন্ধ হলে এটা-ওটা হাসি-তামাশার কথা বলে, রাগিয়ে, কাঁদিয়ে আবার হাসিয়ে ছাড়ত। সে আছে বলেই বাড়ি সরগরম করত। কখনও কোথায় দিনেক-পাঁচেকের জন্য বের হলে বাড়ি খাখা করত। সেই ছেলেটিই একদিন কেমন জানি হয়ে উঠল।

গ্রামেরই একজন, দীর্ঘ রোগ ভুগে শহরের চিকিৎসালয়ে ইহকালের লীলা শেষ করল। গরুর গাড়ীতে করে তার লাশ গ্রামে আসল। গরুর গাড়ি তো আর যান্ত্রিক গাড়ির মত দ্রুত চলে না। সময় গড়ালো। প্রচণ্ড গরমে লাশে পচন ধরল। গন্ধ ছড়াল। যারা সাথে ছিল, তারা কোন রকমে নাক চেপে, মন চেপে, নিজেদের কর্তব্য-কর্ম পালন করল। মনকে প্রবোধ দিল, এই একটি কাজই তো বাকি, এই তো শেষ কাজ শেষ হলে আর কোন দায়িত্ব শেষ থাকবে না, এই লোক আর কোন কিছু আবদার করবে না, সেবা করতে ডাকবে না। এই তো তার শেষ। একদিন তাদেরও সব শেষ হবে। আজ যদি তারা ভাল কিছু করে, শেষ দিনে তাদেরও ভাল কিছু হবে। গরুর গাড়ীতে করে যারাই লাশের সহচর হয়ে আসছিল, তারা অবাক হয়ে গেল- আজ তারা জীবনের কত জটিল দর্শন নিয়ে ভাবতে পারছে। নিজেদের তারা অনেক জ্ঞানী ভাবল। ভাবল, তাদের দিব্যচক্ষু আজ খোলে গেছে। লাশের উছিলাতেই এমন হয়েছে। মৃতের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতার শেষ রইল না। তারা ভেতরে ভেতরেই ভাবল, পাশের জন জানল না। পাশের জনও ভাবল, তার পাশের জনও জানল না। অবশেষে বেলা গড়াতে গড়াতে যখন তারা গ্রামে আসল, আসার আগেই খবর রটে গেল। দুঃসংবাদ বাতাসের আগে ধায়, সেদিন দূর্গন্ধ তারও আগে ছড়াল।

আশ্চর্য হয়ে সকলে দেখল, কারও চোখে জল আসছে না। তার চেয়ে তাড়া বেশি, যতদূর সম্ভব লাশকে সমাধিতে নিতে হবে। এমনকি শেষবারের মত বাড়িতে নিয়ে যাবার কথাও কেউ ভাবল না। দীর্ঘ রোগ ভোগে মৃত্যু হয়েছে, সবাই তার মৃত্যুই কামনা করেছিল। যখন মৃত্যু হল, তখন তাকে মাটির ঘরে ফেলে চাপা দিয়ে ইহকালের সকল চিহ্ন মুছে দিতে চাইল। যেন- মাটির নিচে গেলেই সব মুছে যায়। পৃথিবীতে থেকেও আরেক জগতের হয়ে যায়। সকল আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সবাই এসে জড় হল নদীর তীরে, শ্মশানভূমিতে। বেশি কাঁদবে, অমন সম্পর্কের যারা ছিল, তারা কাঁদতে গিয়ে দেখল তাদের কান্না আসছে না। সব কান্না অনেক আগেই তারা কেঁদে ফেলেছে। তবুও চেষ্টার ত্রুটি হল না। রোদালীদের মত কান্নার রোল তুলল। এর মাঝেও যে কেউ কেউ মৌলক ও নৈতিক কান্না কাঁদে নাই, তা বলে অঙ্কুশ তোলতে চাই না। যার যার কাঁদার কাঁদল, হৃদয়-বিদারক হল। শব শ্মশানে শায়িত হল। সব হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

চঞ্চল সেই ছেলেটি সব দেখল। সে দেখল দীর্ঘ পচন রোগে বলতে গেলে প্রায় সদ্যমৃত গলিত শব। দূর্গন্ধ। জরা-জীর্ণ শবের চেহারা। দুঃখক্লিষ্ট। অশান্ত। মৃত্যুকালেও যেন শান্তির ছায়া ছিল না। সে কান্না দেখল। রোদন দেখল। শব শ্মশানে শায়িত হতে সবাই পেছন ফিরে বাড়ি চলল। সে সবার পিছে পিছে চলল। ততক্ষণে সে নিজেকে লক্ষ্য করে দেখল না, তার সবকিছু অতীত হয়ে গেছে, তার চঞ্চলতা নেই। সে ভাবুক হয়ে গেছে। সবাই আগে আগে চলল। সে পিছে পিছে। সবাই কথা বলে বলে যেতে থাকল, কেউ কেউ তখনও কেঁদে কেঁদে। সে শুধু নিশ্চুপ। তার কন্ঠ দিয়ে কথা বের হল না।

তারপর থেকে সেই ছেলেটি একেবারে বদলে গেল। সে কথা কম বলত, অথবা একেবারেই বলত না। সারাক্ষণ ভাবত। সকাল হয়নি, অথচ তাকে দেখা যেত নদীর ঘাটে। অথবা মাঝরাতে দেখা যেত শ্মশানের ধারে, বটগাছের তলে। রটনা রটল, তাকে ভূতে পেয়েছে। সদ্য পরিবারের সদস্য কমা সেই দীর্ঘ রোগে ভোগা মৃত লোকটির পরিবারের উপর দোষ পড়ল। মৃত লোকটির উপর দোষ পড়ল, কিন্তু কেউ ভয়ে তার নাম নিল না। পাছে নাম নিলে, সে মৃত থেকে সাকার হয়ে যায়। যারা একদিন তাকে ‘তুই-তাই’ করে কথা বলত, তারাও সম্ভ্রমে তার কথা বলত- নাম মুখে না নিয়ে। শুধু সকল দোষ, সকল ক্রোধ, সেই বাড়িটির উপর পড়ল। সেই বাড়ির হতভাগা মানুষগুলির উপর পড়ল। যারা এতদিন রোগ-ভোগান্তি দেখে দেখে নিজেরাও ভোগেছিল, যখন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে বলে বুক ভরে শান্তির নিঃশ্বাস নেবে- তখন আরেক ভোগান্তি দুয়ারে এসে দাঁড়াল। তারা একঘরে হল।

মাঝে মাঝে এমন হয়, ঘটনা ঘটতে শুরু হলে ঘটতে থাকে। দীর্ঘ খরার পর বাদল শুরু হলে বাদল দীর্ঘ হতে থাকে। একটি ঘটনায় রোদালীর রোদন কান থেকে মুছে যেতে না যেতে, আরেকটি রোদন শুরু হল। সেই ছেলেটি নিখোঁজ হল। নিখোঁজ নয়, সে সবার কাছে মরে গেল। নদীর ঘাটে তার জুতা রাখা। পরনের কাপড় রাখা। রাতের বর্ষণে প্রবল ঢল নেমেছিল। অতএব, সিনান করতে নেমে ছেলেটি ডুবেছে। না হলে, ছেলেটি কোথায় যাবে। সাঁতার জানা ছেলেটি অবশ্যই ফিরত যদি বেঁচে থাকত। সেই ‘উনিই’ তাকে ধরে নিয়ে গেছেন, মানে সেই মৃত লোকটি মাটিচাপা ঘর থেকে কলকাঠি নাড়ছেন। কারও অবিশ্বাস হল না যে ছেলেটি মরেছে। একটি ঘটনার পরে আরেকটি ঘটনা, নাড়া দেবার মতই। সবাই এতদিনের ইহলৌকিক খোলস ছেড়ে জোর করেও পরলৌকিক হল। যেন, এছাড়া আর উপায় নেই। এছাড়া আর শান্তি নেই। স্বস্থি নেই। ইহলৌকিক হয়েও পরলৌকিক হয়ে গেলে, পরলৌকিক সত্ত্বা হয়তো সমমেরুতে বিকর্ষিত হবেন। তাদের ক্ষান্ত দেবেন।

লেখাপড়া জানা মেধাবী ছেলেটি মরে গেল। যার বড় হয়ে বড় উকিল হবার কথা ছিল। আর সবার কাছে ছেলে হলেও সে তো বড়ই ছিল। পঁচিশের ঘর পার হওয়া ছিল। তার অবর্তমানে তার বাড়িটি নিরব-নিস্তব্ধ হল। সকল হাসি মিলিয়ে গেল। কেউ জোরে কথা বলে না। কেউ জোরে হাসে না। বলা ভাল, কেউ হাসেই না। তার মা প্রতিদিন পালা করে, সকাল দুপুর রাতে, ছেলের ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটি আঁচল দিয়ে মুছেন। সেখানে চোখের জল পড়ে। জল শুকায়। রান্না ঘরে তার পাত খালি পড়ে থাকে। তার পাতে কিছু তুলে দিতে গিয়ে শূন্য দেখে আঁতকে উঠে গৃহবধূ ফিরে আসে। এভাবে চলতে চলতে সবাই স্বাভাবিক হল। শুধু মায়ের পালা করে ফ্রেমে বাঁধা ছবি মুছা বন্ধ হল না।

ছয় মাস পরে আবার একদিন গ্রামে হুল্লোড় উঠল। সেখানে ভয় ছিল। কৌতূহল ছিল। দেখা গেল, সেই ছেলেটি- শতচিহ্ন-ছিন্ন পোশাক গায়ে ধীরে ধীরে মেঠো পথ ধরে বাড়ি ফিরছে। লম্বা লম্বা চুল। চোখ তার লাল লাল, বড়সড়। কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ। লম্বা গোঁফ, লম্বা দাড়ি। রোদে জ্বলা তামাটে শরীর। জরাজীর্ণ ম্লান দেহের লাবণ্য, ব্যথা-বেদনা-অনাহারক্লিষ্ট ছাপ; শুধু সে নির্বিকার। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়ানো একদার পরিচিতজন তার কাছে অপরিচিত হল। সে কারও সাথে কথা বলল না। তাকিয়ে দেখল না। কেউ কেউ সাহসে ভর করে কথা বলল, সে কানে তুলল না। সোজা বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকল। সে বাড়ি পৌঁছার আগেই রটনা রটল, ছেলেটি দৈবিক হয়েছে।

ছেলেটি বাড়ি ফিরছে শুনে হঠাৎ প্রবলে চমকে যে উচ্ছ্বাস সবার মাঝে দেখা দিয়েছিল, ছেলেটিকে দেখে তা উবে গেল। ছেলেটি উঠানে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না। অবিশ্বাস্য এবং আশ্চর্যান্বিত হবার স্নায়বিক চাপে অন্যদের মুখেও কথা আসল না। কারও কারও মনে হল, জীবন্ত না দাঁড়িয়ে সেখানে যদি তার লাশ হত, তাহলে সরল-স্বাভাবিক রোদনে মন শান্তি পেত। ছেলে ফিরেছে শুনে মা ছুটে আসলেন, ফ্যালফ্যাল করে তাকানো ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মুখে হাত বুলিয়ে স্নেহের কথাসব বলতে বলতে তার মায়েরও হঠাৎ মনে হল- এই ছেলেটি থেকে ফ্রেমে বাঁধা তার ছেলেটি ঢের ভাল, সেখানে কেঁদে কেঁদে শান্তি মেলে। রান্না ঘরে পাতে খাবার তোলে দিতে গিয়ে গৃহবধূ সেদিনও আঁতকে উঠল, শূন্য নয়- ভরা পাত দেখে। পরিবারের সবাই জীবন্ত-প্রত্যাবর্তিত ছেলেটির মাঝে আগের সেই চঞ্চল ছেলেটির খোঁজ করল। কিন্তু পেল না। তখন তাদের মন হল, মৃত হয়ে মৃত হয়ে যাওয়া স্মৃতির সেই ছেলেটিই তো ভাল ছিল। মৃত্যুশোক ভুলে অতীতকে সরল-স্বাভাবিক করে নেওয়া পরিবারের কাছে মৃত্যুশোকের যন্ত্রনার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াল জীবন্মৃত ছেলেটির উপস্থিতি। সেদিন সবার অলক্ষ্যে, সবার মানসিক যন্ত্রনার আড়ালে, আরেকটি চিরসত্য যে সবার সামনে দাঁড়িয়েছিল- তা কেউ দেখেনি। মৃত্যু যতই শোকের হোক, সেই শোক পরে যন্ত্রনা মুছে গিয়ে মৃত্যু অতীত হয়ে আবার যদি জীবন্ত সত্ত্বা ফিরে আসে, তাহলে মৃত্যুশোকের হারানোর যন্ত্রনার চেয়ে ফিরে পাওয়ার পারিপার্শ্বিক যন্ত্রনা অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়; মনের কাছে, শান্তি-স্নেহ-মমতা অথবা লোভ-লালসার কাছে। এই পরিস্থিতি কদাচিৎ কেউ কেউ পায়, এতেই রক্ষা।

পনর দিন পরে আবার গ্রামটি হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। অথবা পরিবারটি। আবার তাদের মুখে হারানোর ছাপ দেখা গেল। কিন্তু কেউ কাঁদল না। এমনকি মাও না। কিন্তু তার অতীতের অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া পালাটি আবার শুরু করলেন। সেই ফ্রেমে বাঁধা ছবি দেখে কাঁদলেন। শান্তি পেলেন। গৃহবধূটি যেন ছয়মাসের অভ্যস্থ পাতটি আবার খালি দেখে শান্তি পেল।

রাতে বৃষ্টি হয়েছিল, শেষ রাতে সেই বৃষ্টির রেশ প্রবল ঘুম হয়ে চরাচরে নেমেছিল। প্রহরটি রাতের চৌর্যপ্রহর, সকাল হতে ঘন্টা দুয়েক বাকি থাকে। রাজ্যের ঘুম চোখে নামে। শুধু চোর আর কুকুর ছাড়া সভ্য চরাচরের আর সকল জীবই তখন ঘুমায়। সেদিন বৃষ্টি ছিল বলে কুকুররাও ঘুমাল। তাই কেউ জানল না। কেউ দেখল না। কেউ সাড়া পেল না। শেষ রাতের শেষ প্রহরে একটি লোক হেঁটে চলেছিল মেঠো পথ ধরে। যার কাঁধে ব্যাগ ছিল। শতচিহ্ন-ছিন্ন পোশাক ছিল গায়ে। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু তার চলার গতি দেখে বুঝা যাচ্ছিল সে নির্বিকার। সেদিন কেউ জানত না, লোকটি জানত কি না জানি না, এইপথে সে আর কোনদিন পা মাড়াবে না। এইপথ একদিন পথ থাকবে না। এই লোকালয় থাকবে না, মাঠ থাকবে না। রাতে অন্ধকারকে আরও কালো করে দেওয়া শ্যামল বৃক্ষরাজি থাকবে না। শ্মশান থাকবে না। নদীর ঘাট থাকবে না।

নদীর ঘাটে নৌকা বাঁধা ছিল। প্রবল বর্ষণে ঢল নেমেছিল। লোকটি একটি নৌকায় উঠে বসল। নোঙর তুলল। ঢলের প্রবল টানে ভেসে চলল নৌকা। হাল ছাড়া, বৈঠা ছাড়া। নির্বিকার লোকটি বসে রইল। তার নৌকা কখনও এই তীরে, কখনও ঐ তীরে লাগল। স্রোতের টানে আবারও ভাসল। আবারও আটকাল। সকাল হতে হতে, লোকালয় আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে, নৌকাটি দক্ষিণের পথে অনেক দূর এগিয়ে গেল। মেঘের আড়ালে ঢাকা সূর্য মাথার উপরে উঠে এলে আড়মোড়া ভাঙা জেলেদের নৌকা দেখল- মাঝি বিহিন, হালহীন একটি নৌকা, স্রোতের ক্রিড়ানট হয়ে ভাসছে। আরও কিছুপথ গেলে বড় নদীতে হয়তো ডুববে। তারা হাতপা গুটিয়ে বসে থাকা লোকটিকে ডাকল। সাড়া পেল না। লোকটি তাকালো না।

সংসার সাগরের দুঃখ-তরঙ্গে আশাকে ভেলা করে বেঁচে থাকা সমাজের অতি নীচ এই জেলে-মাইমলরা তাদের চেয়েও উচ্চতর দর্শন বুকে পোষণ করে। বংশ পরম্পরায় তা তারাই শুধু জানে। ভবসাগরের তরী পার করে দিতে যে কানাইয়াকে নাইয়া হতে তারা প্রজন্ম প্রজন্ম চোখের জলে, দুঃখের সম্বলে ডেকে ডেকে যায়, যে ছবিটি তাদের চোখে ভাসে, সেই ছবিটির দেখা পেয়ে তারা ছেড়ে দেবে- নীচ হলেও অমন ছোট লোক তারা নয়। সমাজের বড়কূল সম্ভ্রান্ত হলেও- অমন ছোটলোক নির্দ্বিধায় হতে পারে। তারা তা জানে। সমাজের কাছে নীচ হলেও তারা গর্ব করে। পতিত শুনতে শুনতে মনোবলে পতিত হয়ে অতলে নিঃশেষ হবার আগে- এমন কিছু মনোবোধ পতিতপাবন হয়ে তাদেরকে ধরে রাখে, তারা বেঁচে থাকে। তাই ভবসাগরের নাইয়াবিহিন নাও দেখে সেই নাওয়ের কাণ্ডারী হতে তাদেরই দুজন লাফ দিল ভরা নদীতে। ভবসাগর না হোক, উত্তাল এক নদীর নিরাপদ তীরে এসে ভিড়ল কাণ্ডারীবিহিন তরীটি। আর সেই লোক, সেই শতচিহ্ন-ছিন্ন পোশাকের দাড়িওয়ালা-গুম্ফধারী, ভয়ংকর চাহনির আড়ালে ব্যথা-বেদনার শতক্লিষ্ট বিভূতি ধরে রাখা লোকটি তখনও নির্বিকার। মাঝে মাঝে সে আকাশের দিকে তাকায়। কখনও স্থির দৃষ্টিতে সামনে।

বেলা বেড়ে গেলে ক্ষুধার্ত ভেবে জেলেরা এক পাত গরম ভাত বেড়ে দেয়। ভাতের ধূয়া উড়তে থাকে। তাজা মাঝের ঝোল ধূয়া ছড়াতে ছড়াতে পাতে নামে। সেই ধূয়া জুড়ায়। ভাত ঠাণ্ডা হয়। ঝোল ঠাণ্ডা হয়। নির্বিকার লোকটি একসময় খেয়াল করে। গোগ্রাসে খেতে থাকে। দূর থেকে দর্শক হয়ে দেখা জেলেরা খুশী হয়। কারও কারও চোখে জল আসে। আহা রে- কতদিন না জানি লোকটি খায়নি! তারা ভাবে, তাদের চেয়েও হতভাগা এই পৃথিবীতে আছে।

মাইমল-ধীবরদের যে অস্থায়ী আস্তানায় মানবতার একটি ক্ষুদ্র নাটিকা মঞ্চস্থ হচ্ছিল, তার অদূরেই খালাসীরা মালামাল তোলছিল একটি জাহাজে। জাহাজটি তাদের- যারা সূর্য পূর্ব দিকে উঠে বলে পুবের পৃথিবী দেখতে বেরিয়েছিল পশ্চিমে উঠা তাদের জ্ঞানের সূর্যকে বল করে। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে, শতচিহ্ন-ছিন্ন পোশাকের সেই লোকটি জাহাজে উঠে পড়ে। খালাসীদের সাথে ঘুমিয়ে পড়ে এক কোণে। রাত ভোর হবার আগেই যখন জাহাজ দূর দেশের পথে রওয়ানা হয়, তখন কেউ খেয়াল করে দেখেনি যে খালাসীদের সাথে আরেকটি লোক অজানার পথে পা বাড়িয়েছে। যখন বেলা হয়, যখন সবাই দেখে, আশ্চর্য হয়, কিন্তু এ নিয়ে তাল-মাতাল কাণ্ড-কারখানার কোন কারণ কেউ খুঁজে পায় না। তারা জিজ্ঞেস করে। নির্বিকার লোকটির উত্তর না পেয়ে পাগল ভেবে যার যার কাজে লেগে পড়ে। নাওয়া-খাওয়া করে। বিশ্রাম নেয়। গান গায়। গুটি খেলে। বিড়ি ফুঁকে। দয়া করে এক থালা খাবার ঠেলে দেয় পাগলের দিকে। পাগল দেখে বা না দেখে। সময় গড়ালে একসময় খেয়ে ফেলে। কখনও উঠে গিয়ে সবার সাথে গোসল করে। অন্যরা রাস্তা ছেড়ে দেয়। প্রাকৃতিক কাজ সেরে আসে। পৃথিবীর কাছে সে পাগল! অপ্রকৃতিস্থ!

এভাবেই একদিন, মাস চারেকের জলযাত্রা শেষে নোঙর করে জাহাজ। খালাসীরা মালামাল নামানোতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাকি সবকিছু আগের মত চলতে থাকে। খাওয়া-দাওয়া-নাওয়া, খেলাধূলা। রাত নামে। ঘুম নামে। সকাল হয়। পাগল লোকটিকে জাহাজে আর কেউ দেখে না। এদিক-ওদিক খুঁজে আগ্রহ হারিয়ে নিজেদের কাজে লাগে। পাগল লোকটিকে তখন দেখা যায় শহরের পথে। এলিয়েনের মত লোকটিকে পথচারীরা দেখে যায়। পাশ কাটিয়ে যায়। একসময় পুলিশ আসে। জিজ্ঞেসাবাদ করে। নির্বিকার লোকটির কাছে উত্তর না পেয়ে ধরে নিয়ে যায়। তার ব্যাগ দেখে। সেখানে মলিন-ছিন্ন কাগজে অনেক লেখা দেখে। কিন্তু তারা সেই লেখা পড়তে পারে না। তারা আগ্রহবোধ করে, কৌতূহলবোধ করে। তারা খুঁজতে থাকে, কে পড়ে দিতে পারে কি লেখা আছে। একদিন তারও খুঁজ মেলে। মলিন-ছিন্ন কাগজের লেখাগুলি তাদের ভাষায়। তাদের হরফে রূপান্তর হয়। তারা অবাক হয়ে দেখে। অবাক হয়ে ভাবতে থাকে। জীবনকে ঘিরে অমন গভীর কথা তারা কেউ শুনেনি। কেউ দেখেনি। কেউ পড়েনি। কেউ জানেনি। সেদিনই প্রথম দেখল, সেদিনই প্রথম পড়ল। অন্যরা শুনল। ঘটনাটি রটল। পাগল লোকটিকে তারা পুনর্বাসন করল।

একদিন বড় বড় মাথাওয়ালা লোক, যারা বড় বড় চুলওয়ালা-গোঁফওয়ালা, তারা বসলেন। তারা পড়লেন। চোখ কপালে তোললেন। তাদের মদের গেলাস খালি হল। তাদের চুরুট শেষ হল, আরও জ্বলল। তাদের মুখ দিয়ে বের হল ‘মহান’, ‘মহান’, ‘মহান’! সেদিনই তারা দেখা করতে ছুটলেন। কিন্তু তারও আগে স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপ বন্ধ হতে সেই পাগল লোকটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল চিকিৎসালয়ে। কিছু কাজে আসেনি। নির্বিকার থেকে সেই লোকটি নির্বিকারতর হয়ে যায়। তার শব বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। দলে দলে লোক পিছে পিছে ফুল হাতে ছুটে চলে। মাটিতে শায়িত হয়। সেই দীর্ঘ রোগে ভোগা পচন ধরা শবদেহের মত তাকেও মাটি চাপা জগতে যেতে হয়। মাটির উপরে স্তম্ভ হয়। কারুকার্য হয়। লেখা থাকে এক নাম- ‘অ্যানোনিমাস’। ঢালি ঢালি ফুল জড় হয়। পাশে বাগান হয়। গোলাপ ফুটে। সুগন্ধ ছড়ায়। সময় গড়াতে থাকে। মাস যায়। বছর যায়। শ্যাওলা জমে। পরিস্কার হয়। আবার রঙ পড়ে। চকচক করে।

বছর বছর পেরিয়ে এভাবেই একদিন তাকে নিয়ে আলোচনা হয়। গুরুগম্ভীর কন্ঠে চলে তার স্মৃতিচারণঃ ভাবতে অবাক লাগে, ভাবতে শিহরণ জাগে, আমাদের শহরের এই পথে একদিন হেঁটেছিলেন তিনি। এই শহরের বায়ুতে তিনি নিঃশ্বাস নিয়েছিলেন। হয়তো তার নিসৃত সেই বায়ু আজও আমরা গ্রহন করি। যে ধূলি তার গায়ে লেগেছিল, সে ধূলি আজও হয়তো আমাদের গায়ে লাগে। তিনি চিনেন না আমাদের, অথচ তিনি আমাদের সকলের চেনা। রক্ত-মাংসে গড়া- একদিন লিখে গেছেন আমাদের জন্যে। আজ তিনি মাটিতে মিশে গেছেন, অথচ তার মলিন-ছিন্ন কাগজের লেখাগুলি চকচক পুস্তকের সাদা পাতায় অমান হয়ে আছে।……

বক্তৃতা শেষ হয়। পিনপতন নিরবতা নামে। সবাই নিজেকে নিয়ে ভাবে। জীবন নিয়ে ভাবে। মিলনায়তনের চেয়ারগুলো খালি হয়। পাগুলো জোড়ায় জোড়ায় নীড়ে ফিরে। হৃৎপিণ্ড রক্তের সঞ্চালন ঘটাতে থাকে। ফুসফুস বাতাস নিতে থাকে। আর তখন, নাম না জানা নির্বিকার পাগল সেই লোকটির, একদার চঞ্চল সেই ছেলেটির একদার গাঁয়ের মেঠোপথে নদী প্রবল স্রোতে বয়ে যেতে থাকে। ইলিশের দল ঝাঁকে ঝাঁকে চলতে থাকে। একদার নৌকার ঘাটে মাঝনদীর চর জাগে। সেখানে বক-পাখালি আর কাকের আসর বসে। মাঠ নেই। গ্রাম নেই। গাছ নেই। সেই শ্মশান নেই। দীর্ঘ রোগে ভোগে সেই লোকটি নেই। তার শায়িত শয্যা নেই। চঞ্চল ছেলেটি নেই। তার মা নেই, বাবা নেই, ভাই নেই। পাতে ঝোল দিতে গিয়ে চমকে যাওয়া সেই গৃহবধূ নেই। ফ্রেমে বাঁধা সেই ছবি নেই। নির্বিকার পাগল লোকটি নেই। ছিন্ন-মলিন কাগজে তার লেখাগুলো শুধু এখনও চকচক করে।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে আগে লগইন করুন।

জলসাঘরে স্বাগতম!

প্রবেশ পথ

কুঞ্চিকা হারিয়েছে?

সদস্যপদের জন্য

কৃপা করে সারথির কাছে বার্তা প্রেরণ করুন: [email protected]