জলসাঘর » বাংলা সাহিত্য » নীঝর বিভৃতি
author photo

নীঝর বিভৃতি

বৃষ্টিভেজা একটি দিন ছিল, আর আমি ছিলাম ঝড়ে ভেজা। অনেক পথ হেঁটেছি খজল গায়ে মেখে। চুল বেয়ে জল পড়েছে। নীরদে জন্ম নেওয়া তখনকার নীরজ অনুভূতির কথা কী বলব! এর চেয়ে সুখ আর কী হতে পারে!

আমি বহুবার খেয়াল করে দেখেছি, আকাশ কালো হয়ে এলে আমার ভাল লাগে। ঝড় এলে আমার ভাল লাগে। খালি গায়ে তুফানের ঝটকা খেতে ভাল লাগে। বৃষ্টির ফোটা গায়ে মাখতে ভাল লাগে। অথবা জানালার ধারে বসে বৃষ্টি দেখা, গাছের পাতায় টুপটাপ, জলের ধারা বেয়ে বৃষ্টির টাপুর-টুপুর সাজ। প্রতীজ্ঞা করে ছাড়তে গিয়েও আমার হাতে তখন ধূমশলাকা উঠে আসে। ধূমায়িত চায়ের কাপের মত আমার ফুসফুস ধূমায়িত হয়। মৃত্যুর পরোওয়ানা একটু একটু করে এগোতে থাকে। কিন্তু ভাল লাগে!

নিজেকে অনেকবার মরতে দেখেছি। বলতে গেলে, কতবার নিজেই জানি না। একবার একেবারেই মরতে হবে, তাতে আর কী ভয়। সব ভয়, সব শঙ্কা, সব যন্ত্রণা তো- মরে গিয়ে বেঁচে উঠে মরতে যাবার কাছেই। হ্যাঁ, আমি একে-ওকে-তাকে অনেক ভেবেছি, জলধারার প্রতি বিন্দুতে বিন্দুতে ভেবেছি। অভিযোগ ছিল না, অনুযোগ ছিল না; জলসাঘরে শরাবের সাথে আগরের ঘ্রাণের মত তারা সবাই ছিল। তারা এসেছিল, সৌরভ দিয়েছিল, মিলিয়ে গিয়েছিল- তখনও আকাশ অবিরল ঝরছিল, আরও ঝরবে, অনন্তকাল ঝরবে। তারা কতকাল আসবে জানি না, আর আসবে কি না জানি না। আগরের মত ক্ষণিকের সব। দিব্যি দিয়ে তবু বলতে পারি, ধূপের ধূপিত সুবাসে কোন ঘৃণা নেই, স্মৃতির আগর-বিভূতির আগারেও কোন জ্বলন নেই।

যে মেয়েটি আমাকে এক পেয়ালা গরম চা দিয়ে গেল, তার সাথে আমার কোন মনোজাগতিক সম্পর্ক নেই। জানালার অদূরে আকাশের নীর ঝরছিল, আর মনে হল- সে সেদিনও ছিল যেদিন আমি পারস্যের সরাইখানায় অধরে শরাব লাগিয়েছিলাম। সুরে মূর্ছিত হয়ে যে নাগরীর পায়ে লুটিয়েছিলাম, সেই নারী সেদিন সে-ই ছিল। আটপৌরে তার সাজ, এলোমেলো চুল কপালে এসে পড়েছে,- তবু মনে হল তাতে উপমা আছে, শান্তি আছে, সুখ আছে। মনে হল, নিভে গেল, পেয়ালা খালি হতেই এ খেয়াল ডুবে গেল। সে ও আমি, আটপৌরে ইহজাগতিক।

পাহাড়ের উপরে আমি, পাতাহীন একটি গাছের নিচে। চারপাশ কেমন জানি ধোঁয়া ধোঁয়া। ঘাসের পাতায় লকলক করে দাঁড়িয়ে তাকা জোঁককে পাশ কাটিয়ে এসেছি। সে তখনও হয়তো আড়ালে প্রতীক্ষা করছে। কামনা বাঁচিয়ে রাখে, উজ্জীবিত করে রাখে- কিন্তু লাল আঙ্গার হাতে নিয়ে এক পলের বেশি চলা যায় না।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন:

২ টি মন্তব্য “নীঝর বিভৃতি”

  1. আদাব শর্মা – ই – আযম :)
    লিখাটি দারুণ ।

    বানান টা কি বিবৃতি :-?

    • না, বানানটা ঠিক আছে।

      ভৃতি মানে পালন বা ভরণপোষণ। বেতন বা মজুরিও হয়। এর সাথে ‘বি’ উপসর্গকে জুড়ে দিয়ে শব্দটিকে অর্থদ্যোতক করার প্রচেষ্টা হয়েছে।
      একজন মানুষ নিজেকে অনবরত কিভাবে বিভিন্ন কিছুর মাঝে লালন-পালন করে যায়, সেটা বুঝাতেই ‘নীঝর বিভৃতি’ ব্যবহার করা হয়েছে।
      নীঝর মানে হলো ঝরণা।

      বিভৃতি আরও অর্থ হলঃ সমর্থিত, লালিত। (সাপোর্টেড, মেনটেইন্ড)

      ধন্যবাদ দেবী।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে আগে লগইন করুন।

জলসাঘরে স্বাগতম!

প্রবেশ পথ

কুঞ্চিকা হারিয়েছে?

সদস্যপদের জন্য

কৃপা করে সারথির কাছে বার্তা প্রেরণ করুন: [email protected]