মাঝ আকাশে পশ্চিমে একটু হেলান দিয়ে চাঁদ উঠেছে। কোন তিথি কে জানে। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি বেশ করে ধোয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণ। বৃষ্টি থেমেছে। ধোয়া কাপড়ের মত ঝকঝকে আকাশ, যেটুকু দেখা যায় তিথির চাঁদের আলোয়। থেকে থেকে কোন এক অজানা ফুলের গন্ধ আসছে।
টেবিলে হারিকেন জ্বলছে। আলো কমিয়ে দিলাম। চেয়ার টেনে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। আকাশ দেখছি। মিটিমিটি কয়েকটি তারা দেখছি। আঁধারে কালো হয়ে আছে ঝোপঝাড়। ঝিঁঝিঁ ডাকছে। ব্যাঙ ডাকছে। বুঁদ হয়ে আছি। বুনো নির্যাশের পেয়ালাটা কবেই খালি হয়ে গেছে। বড় শখ করে আনিয়েছিলাম। বড় ভাল লাগে। সুখের ঘোর নিয়ে আসে। বসে বসে ভাবি। তলিয়ে দেখি। নিজেকে, প্রকৃতিকে, মানুষকে, জীবনকে……।
দরজায় টকটক, ‘প্রফেসর আছেন?’ গলা শুনে চিনতে পারলাম। পাশের বাগানের ম্যানেজার। এখানে আসার পরেই পরিচয় হয়েছিল। একদিন বেড়াতে যাবার বিনীত নিবেদন করেছিলেন। ফিল্ড স্টাডির ব্যস্থতায় সময় হয়ে উঠেনি। দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে আসতে বললাম।
চা নিতে অনুরোধ করতেই বললেন, চা এখানে নয়- ম্যাডামের ওখানে নেব। ম্যাডাম হলেন বাগানের মালিক। উনার কথা শুনেছি আশেপাশে লোকদের মুখে। বাবার সম্পত্তি বাটোয়ারা করে ভাই-বোন সবাইকে দিয়ে, এই একটি বাগান নিয়েই নিভৃতে পড়ে আছেন। লোকে বলে পাগলী ম্যাডাম। বিচিত্র খেয়াল। পাকা বাংলো থাকতে মাটির ঘরে থাকেন। একা থাকেন। ম্যানেজার ও অন্যান্যরা বাড়ির সীমানার বাইরে থাকেন, কাছাকাছিই। সবচেয়ে অবাক লেগেছিল শুনে, তিনি সংগীত প্রিয়। একাকিনী সংগীত চর্চা করেন।
কাজের ব্যস্থতায় ভুলে গিয়েছিলাম, আজ আমার যাবার কথা ছিল। আমার বিলম্ব দেখে ম্যাডাম ম্যানেজারকে পাঠিয়েছেন। লোকমুখে শুনে ম্যানেজারকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম। আগ্রহ প্রকাশ করেছিলাম সংগীত নিয়ে। উনি আলাপ করেছিলেন বোধ হয়। তাই বিনীত নিমন্ত্রন ছিল।
প্রকৃতির ভাবনায় ছেদ পড়াতে একটু-আধটু বিরক্ত হয়েছিলাম। নিমন্ত্রনের কথা মনে পড়ে যাওয়াতে যাওয়া উচিত বলেই মনে হল। একজন লোক পাঠিয়েছেন, তাকে ফিরিয়ে দেওয়া, আর যাই হোক- ভদ্রতা হবে না।
বাতির প্রয়োজন নেই। পথ দেখা যাচ্ছে। সতর্কতার জন্য টর্চ সাথে নিলাম। বিহারে বেরিয়ে কোন কোন সাপ পথে শুয়ে থাকে। কখনও তাদের চলার পথ একসাথে মিলে যায়। নুড়ি ভরা পথ। কাদা নেই। বৃষ্টি হওয়াতে ভেজা ভেজা। কোথাও একটু পিচ্ছিল। পাশাপাশি ম্যানেজারের সাথে চললাম। বয়সে মধ্য পরিক্রমায় আছেন। ম্যাডামের বাবার সময়ে চাকরীতে এসেছেন। সেই থেকে বিশ্বাসী হয়ে আছেন। তার ধীর-গম্ভীর কথাবার্তা, ব্যবহার; দেখলে মনে হয় কোন পণ্ডিতের মত। ভেতরে অনেক জ্ঞান পুঞ্জীভূত করে রেখেছেন। বিনয়ী এবং প্রভুভক্তির ছাপ সুস্পষ্ট।
মান্দার, কাঁটামেহেদী ও শেওরা দিয়ে তৈরি সীমানা প্রাচীর। গাছগুলো কেটে কেটে সুন্দর করে রাখা, গলা পর্যন্ত উঁচু। ভেতরেই ম্যাডামের মাটির ঘর, কুটির বললেই মানাবে। একটি টিলার উপরে প্রাচীর ও কুটির; সুন্দর নির্বাচন ও সৃষ্টি। টিলার ঢালুতে সমতল কিছু জায়গায় কয়েকটি টিনের আধাপাকা ঘর। ম্যানেজার ও অন্যান্যরা সেখানেই থাকেন।
দোয়ারে দাঁড়াতেই একজন দরজা খোলে দিল। পর্দা সরিয়ে দিয়ে স্বাগতম ভঙ্গিতে ভেতরে আসতে বলল। বাইরে পাদুকা রেখে ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালাম। ম্যাডাম অদূরেই চেয়ারে বসেছিলেন। ভেতরে যেতেই দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। ভেবেছিলাম বয়স্ক কাউকে দেখব। দেখে মনে হল, ত্রিশ পেরোনো কেউ। হাল্কা গোলাপাভ সাদা শাড়ী, লম্বা হাতার কোমর পর্যন্ত ব্লাউজ পরে আছেন। শাড়ীর উপরের আঁচল চাঁদরের মত করে পরেছেন। দেখতে আগেকার জমিদার পত্নীদের মত।
তাদের অমায়িক অভ্যর্থনায় কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। বিনীত কৃতার্থতা জ্ঞাপন করলাম। এর বেশি কিছু বলা হয়তো তোষামোদ হয়ে যাবে। আনন্দের আতিশয্যে লেজ নাড়ানো কুকুরের মত।
পরিচয় পর্ব হল। প্রাথমিক কথাবার্তা চলতে থাকল। আমার রিসার্চ নিয়ে কিছু কথা হল। ম্যাডাম নিজের কথা বললেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। লেখাপড়া শেষ করে তার বাবার সাথে কাজ করেছেন। উনি লোকান্তরে যেতে ভাই-বোনদের উত্তরাধিকার যুদ্ধে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে সব ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন। এখানকার লোক তাকে ছাড়তে চায়নি। সেই থেকেই ছোট একটি বাগানে পড়ে থাকা। আত্মীয়-স্বজনদের লোভ-লালসা দেখে জীবনের বড় এক পাঠ পড়েছিলেন। বিষয়-সম্পত্তি সেই থেকে পঙ্কিলের মত। সংগীতকে ভালবেসেছিলেন শৈশবে। তারপরে বিরহকাল। বিমূঢ় অশান্ত পরিস্থিতিতে সংগীতই মনের শান্তি হয়ে এসেছিল। সেই থেকে,সংগীত নিয়েই স্বেচ্ছা নির্বাসনে।
তার সাথে কথা বলে মনে হল, অনেক কথা জমে আছে তার মনে। সেসব শোনার কাউকে খুঁজছিলেন। বৃষ্টি ছাড়া যেমন বর্ষা বৃথা। শ্রোতা ছাড়া কথা বৃথা। আসর বৃথা প্রশংসা ছাড়া। তার একাকীত্বে জমা কথা, তার বাঁধা সব সুর- শ্রোতা চায়, একটি আসর চায়। আমার আগ্রহই হয়তো তাকে আগ্রহী করে তোলেছিল আমাকে শ্রোতা করতে।
ততক্ষণে চা-পর্ব শেষ হয়েছে। ম্যানেজার নিজেই নিয়ে এসেছিলেন। আমাদের কথার মাঝে আর কারও উপস্থিতি ছিল না। চা পর্বের পরেই ভেবেছিলাম সমাপ্তি হবে। কিন্তু আরও অনেক বাকি ছিল। ম্যাডামই কথা তোললেন। খাবারের আয়োজন করে রেখেছেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে গানের আসর বসবে। আমাকে গাইতে হবে। উনিও গাইবেন। চারজন স্থানীয় বাদককেও নিমন্ত্রন দিয়ে আগেই আনিয়ে রেখেছেন। প্রথম দিনেই এতকিছু! বাড়াবাড়ি লাগল। হয়তো, পাগলী ম্যাডাম বলেই কথা। আগ্রহবোধ করলাম।
মাদুর পাতা এক ঘর। অনেক জানালা। বড় বড় চার দরজা। মাদুরের উপরে শিমুল তোলার গদি। আগে থেকেই বসে আছেন তবলা, সারিন্দা, বাঁশি আর করতাল বাদক। ম্যাডাম বসলেন বীণা নিয়ে। তাদের এই আসরে আমার সুর কর্দমের মতই। গলা ভাল নয়ের বাহানা বানিয়ে পার পেলাম। ম্যাডাম শুরু করলেন। মালকৌষ রাগে ভজনের মত-
কবে জানবি পিরিতি রীতি
যদি তোর নাম ধরে মরি সে তো তোরই লাজ
গগনে গরজে মেঘ মনে গরজে বাজ
আমি ভুলি সব কাজ
দেখা দিও করুণায় এ কী নয় নীতি
কবে বুঝিবি পিরিতি রীতি
মনে হলো কোন বৈষ্ণব মন্দিরে, অথবা কোন সুফী আসরে বসে আছি। স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সারিন্দার টানে রক্তে বহুবার শিহরণ জাগল। বাঁশির কথা কি আর বলব। সে তো বহুকাল আগেই রাই কিশোরীর মন চোরি করে আছে!
আসর শেষে আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যখন বের হলাম। তখন চাঁদ ডুবে গেছে। বাতি না জ্বালিয়েই পথ চললাম। কানে তখনও লেগে আছে সুর। কি অপূর্ব কন্ঠ! অমন কন্ঠের সুধা বারবার পান করেও সাধ মিঠবে না। আমি জানি, আমাকে আসতেই হবে। বারবার!
(চলবে)



ফিরোজ খান বলেছেন:
দাদা, ব্যস্ততায় হয়ে ওঠে নি, তাই দুঃখিত।
তবে পরের বারের জন্য দাওয়াত নিয়ে রাখলাম, নির্ঘাত আমাকে না জানিয়ে কিন্তু আপনি যেতে পারবেন না।
দি তোর নাম ধরে মরি সে তো তোরই লাজ
গগনে গরজে মেঘ মনে গরজে বাজ
“গগনে গর্জে মেঘ মনে গর্জে বাজ” সত্যি অপূর্ব। গর্জে এজন্য লিখলাম যাতে মানুষ দুটোরই ব্যবহার জানে, অনেক আধুনিক বানান (বানাণ)পন্ডিত আছেন, তিল থেকে তালে খ্যাপে উঠেন, আমার আবার এসব ভাল লাগে না, সত্যি গর্জে লিখতে মন চাইলো লিখলাম।
লোভ ধরানো বর্ণনা।হৃদয় কাড়া পরিবেশ, আর হৃদয় ছেদ করা সুরের আভাস।
সজল শর্মা বলেছেন:
বানান নিয়ে কোন সমস্যা নেই। চলিত রীতিতে প্রমিত এসেছে। কিন্তু সংগীতের জন্য নতুন-পুরাতন সব রীতিই নিয়ে আসতে হয়, সুরের সাথে মিল খাওয়াতে, সময়ের সাথে মিল খাওয়াতে।
দেখি, দুই এক দিনের মধ্যে পরের পর্ব আশা করছি।