জলসাঘর » বাংলা সাহিত্য » প্রবন্ধ » মৃত্যুর স্বাদ নেবো কিন্তু মরবো না!

প্রক্রিয়াধীন একটি অনবদ্য প্রেম মধ্যরাতের বৃষ্টিতে মিশেছিলো। বুঝে নিয়েছি নিরবতা পাঠের আনন্দ, বুঝে নিয়েছি বহু কারণে তার শরীর মন ফোটে; প্রতিটি কারণ সমৃদ্ধ, অলংকৃত স্রোতের গল্প; আর সমুদয় স্রোতের তাত্পর্য পৃথক পৃথক রিসার্চ এ্যাকাডেমী। তার জন্য ভালোবাসা রাখি, তার কারণে ক্রন্দন অনুবাদ করি।

মানুষের হাসি ও ক্রন্দন অনুবাদ এক সময় থামে যেইখানে তার নাম দেয়া যায় পথের স্টেশন।

ইফতার করলাম। মাগরিবের নামাজ পড়তে গেলাম। ফরজ পড়ে বসে আছি ক্লান্তির কারণে। মসজিদের লোকেরা, নানান ‘জাতি’র মুসল্লিরা ভাবতে পারেন, আমি তসবিহ/দোয়া পড়ছি।

মানুষ অনেক কিছু ভাবতে পারে। কে কি ভাবছেন আমার কথা ও কাজের ব্যাপারে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কই! মানুষ তো বহু আজগুবি ধারণার ভেতর দিয়ে বিষয়-আশয়ের উপর দৃষ্টি রাখে, বিবেচনা রাখে, চিন্তা ধরে, চিন্তা চাপায়। মানুষের ধারণাদের সম্মান বা অসম্মান কোনোটা না-করে আমি বরং নিজের সাথে ধোঁকাবাজি না-করি। নিজের অনুসন্ধিত্সার সাথে সত্ভাব রাখি, সেই ভালো।

আমি ভাবছিলাম মহাত্মা ফরিদ উদ দীন আত্তার’র ‘পাখিদের সমাবেশ’ (মনতেক্ব আল তায়ের) এর কথা। এ্যাবসলিউট অস্তিত্বের পাখিটাকে খুঁজতে খুঁজতে বিভিন্ন জাতের পাখিরা নিজেদের কাছে ফিরে এলো।

আমার হাতে তসবিহ নেই। তসবিহ শব্দটা ভুলভাবে বাংলা ও উর্দূ ভাষায় বিশেষ্য হয়ে গেছে। মূল আরবী বিশেষ্যটা মোসাব্বেহা বা মিসবাহা । যাক, তসবিহ-ই থাক। মানুষের ভাষাতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ভুল শব্দের শুদ্ধ সম্মান পাওয়ার বিস্তর নজির আছে। ওই তসবিহ মালাটা বেদায়াতে হাসানা, মানে কল্যাণকর নতুন প্রবর্তন মুসলিম কালচারে (যা সরাসরি কোরআন সুন্নাহ’র দলিলে নাই। এই প্রবর্তন জায়েজ। অন্য ধর্মেও আছে জপমালা,রোজারি বিডস ইত্যাদি।

তসবিহদানা তো মহাপ্রকৃতিতে বিদ্যমান। প্রতিটি সৃজন একক একেকটি তসবিহদানা। মির্যা গালিবের তসবিহ দানা সুন্দর সুন্দর নারীমুখ। বলেছেন- ‘মেরা তসবিহ কি এ্যাক এ্যাক দানে হ্যায় ইয়ে সব হাসিন চেহরে/নিগাহে ফিরতে যাতি হ্যায়, ইবাদত হোতে যাতি হ্যায়।’- মর্ম হলো, সুন্দর নারীমুখে নেক নজর রাখার মাধ্যমে সৃষ্টির প্রশংসা, মুলত অপ্রত্যক্ষভাবে স্রষ্টার প্রশংসা করা।

প্রশংসা তাঁর করা হোক বা না, তিনিই একমাত্র ‘আমি’।

‘পাখিদের সমাবেশ’ নিয়ে ভাবতে ভাবতে হৃদপিন্ডের প্রক্রিয়ার দিকে নজর গেলো আমার। এই নজর রাখাটা মস্তিষ্কের দ্বারা দৃষ্টিপাত। ইংরেজী ভাষায় চিন্তা এলো, যেনো পংক্তি আকারে-

The heart say

Ray can emit ray

I pump that’s why

I can pump.

The life say

There is yes and nay

I live that is why

I can live.

সিস্টেমটাই তো এইরকম। একটা বিন্দুতে শুরু হওয়ার পর একটা প্যারাডক্সিক্যাল স্বয়ংক্রিয়তা। আমিই আমারে ধাক্কা মেরে বলি চল সামনে চল! যে-হৃদপিন্ড রক্তসঞ্চালনের মূলে, সেই হৃদপিন্ড এই নিজের সঞ্চালনের কারণেই নিজে সঞ্চালিত হচ্ছে। এই পাম্পিংয়ের একটা শুরু হওয়া আর শেষ হওয়া আছে। মানে ‘আছে’ হওয়া আছে এবং ‘নাই’ হওয়া আছে।

আমি আবারো ইংরেজী চিন্তাকে আসতে দেখি-

Someone said,

‘In the Nature

Things are built for kill.’

If built for kill,

then, why for?

If kill for build,

then,PARADOX it is.

What does the paradox signify?

If, the answer is, LIFE.

Then, Life signifies LIFE !

I signify myself!

জীবন-ভ্রমন পথের পথিক মানুষ। অগণন বর্ণিল পথ। পিচ্ছিল কর্দমাক্ত পথ। ব্যাকা-ত্যাড়া সর্পিল পথ পাড়ি দিতে হবে খুব সতর্কতার সাথে। চলার পথে বহুবিধ বোধের আকর্ষণ দিশেহারা করে। মনের আকাশে মেঘ জমা হয়। মানুষ কলুষিত হয়। মানুষ হায় হায় করে!

এক মায়া-নারী তার হৃদয়ে বসে থাকা পুরুষটিকে বলেছিলো, ‘আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তোমার হৃদয়ে প্রলয়ংকরী ঝড়-তুফান বইছে! ঝড়ের তান্ডবে ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাচ্ছে মনের অঙ্গন।’ পুরুষটি নির্বাক থেকেছে। বলতে পারে নি এরই নাম প্রেম। এরই নাম দহন। এরই নাম বিরহের আর্তনাদ। এরই নাম দুঃখের সুখ। এরই নাম মানুষ প্রতীকের প্রেম চর্চা। একেই বলা হয় সমর্পিত আত্মার আহাজারির পথের সোপান।

অবশেষে একটা সময় আসে, এই প্রতীকী প্রেম চর্চা পরমের প্রেমের চর্চায় রূপান্তরীত হয়। তখন আর মায়া-নারীর প্রেমের প্রয়োজন হয় না। তখন আর কনকনে শীতে কুঁকড়ে যেতে হয় না। ওম পাওয়া যায় ওম! চিরন্তনের ওম! অবিনশ্বরে একিভূত ওম!!

‘বর্ষা দেখাও গ্রীষ্ম দেখাও

শীত বসন্ত শরত দেখাও

স্বর ব্যাঞ্জন বর্ণ শেখাও

ওম ছাড়া শীত মরে না’ (সঞ্জীব চৌধুরী’র গান)

এই হলো জাহেরি দৃশ্যমান কলা-কৌশলের কথা। বাতেনিটা কি? জাহের আছে, বাতেনও আছে। বাতেনকে অস্বীকার করা অর্থহীন। ম্যাটার আছে মাইন্ড আছে। বচন আছে অনিবর্চনের পরিপ্রেক্ষিতও আছে, একবচন দুই বচন বহুবচন আছে। সুন্দর শব্দ (সাউন্ড) আছে, অনুপম নিরবতা আছে। অনুপম নিরবতা! হুমম, অনুপম নিরবতার সামনে ভাষা অসহায় ভিখিরি হয় কেন? মানুষ প্রসঙ্গক্রমে চুপ থেকে অনেক কথা বলে ও পাঠ করে। নিরবতাই এই পাঠদাতা!

মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ব্যাপারটা ‘নবীন বরণ’ অনুষ্ঠানের মতো না। অন্যরকম বরণ। মৃত্যু দেখে মানুষ বলে- ‘চিরকালের জন্যে নিরব হয়ে গেলো’! কই গেলো? এসেছিলো? কোথাও গিয়েছে! কেউ জানে না। বিজ্ঞানী জানালেন- প্রাণের ক্ষুদতর একক প্রোটোপ্লাজম (ইনক্লুডিং সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াস)। প্রোটোপ্লাজমকে ভাঙ্গলে এর মধ্যে আর প্রাণ থাকে না। প্রাণ শনাক্তকরণে আর এগিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না! ‘Just what makes protoplasm alive is still unknown.’

মানুষটা কোথায় গেলেন কেউ বলতে পারেন না!মানুষটি কোথা হতে এসেছিলেন তিনি নিজেও জানতেন না হয়তো। অন্য কেউ বলতেও পারেন না কোথা হতে এসেছিলেন! মাতৃগর্ভে ভ্রুণের মধ্যে মানুষটির প্রাণের সঞ্চার হয়েছিলো। দেহ পিঞ্জর পূর্ণতাপ্রাপ্ত হওয়ার পর পৃথিবীতে জন্ম লাভ করেছিলেন। ছিলেন কোথায় জানা নেই। আলমে আরওয়াহ-রুহের জগত? সেটার বাস্তবতা কী রকম? কেউ জানেন না। দেহ পিঞ্জর ছেড়ে কোথায় গেলেন জানা নেই! আসা আর যাওয়া। পরিব্রাজক!

তবে এটা কি এক সত্য নয় যে,তিনি কোথাও ছিলেন, যেখান থে’কে এসেছিলেন এবং কোথাও গিয়েছেন চলি?

শেক্সপিয়র লিখেছিলেন-

“No traveller returns, puzzles the will

And makes us rather bear those ills we have

Than fly to others that we know not of?

Thus conscience does make cowards of us all.”

–William Shakespear

প্রকৃতিতে আমরা দেখি-

প্রাণ খায় প্রাণ। বস্তু খায় বস্তু। ইলেক্ট্রন খায় ইলেক্ট্রন। এটম খায় এটম। গতি খায় গতি। চেতনা খায় চেতনা। চিন্তা খায় চিন্তা। বর্ণিল এ্যাথিক্সও খায় পরস্পর। দুর্দান্ত খাদ্য উত্সব মর্তে এবং নভে। বিপূল দুঃখমাখা আনন্দে খাদ্য খায় খাদ্য এই ধরিত্রীতে। খেতে খেতে রূপ বদলের খেলা ধুমধাম। হাস্যকর হলো, খাদ্যেরা রাজনীতি কূটনীতির গুটি চাল দ্যায় আর প্রেম-প্রণয়ের ইতিকথা রচনা করে হাসতে হাসতে হাততালি দ্যায়!প্রকৃতিতে ট্রান্সফরমেশন ক্রমাগত।

আর ওদিকে দেখছি-

আমি মরবো এবং মরবো না, দুই-ই সত্য। ধর্ম মোতাবেক ইন্তেকাল করবো। মানে স্থানান্তরিত হবো। পরকালে যাবো। লাইফ আফটার ডেথ-এ যাবো। মানে এই লাইফের মৃত্যু মানে মৃত্যু হওয়া এবং মৃত্যু না হওয়া। মহাত্মা রুমী দেখেছেন মৃত্যু মানে Dawn of eternity. কবি জন মিলটন’র কাছে Death is the golden key that opens the palace of Eternity. বাইবেলে আছে- Whosoever liveth and believeth in me shall never die. কোরআন মোতাবেক worldly life- দুনিয়ার জীবন, আর আখেরাতের জীবন eternal life after death আছে। ইসলাম জানায়, বিচারের আগে, ইহজগত ছেড়ে মানবাত্মা যাবে ইল্লিন নয়তো সিজ্জিন-এ। মানে সে কোথাও থাকছে। আর ‘নাফসুল মোতমাইন্না’- প্রশান্ত আত্মাকে তাঁর রব খোশ আমদেদ জানান- ‘ইয়া আইয়াতু হান্নাফসুল মোতমাইন্না…..। কোরআন জানায়, প্রত্যেক প্রাণকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। (Every Soul Will Taste Death)। তো, মৃত্যুর স্বাদ, ব্যাপারটাতে এক ধরণের মজা আছে। মজা না-থাকলে ‘স্বাদ’ কেন! তার মানে মৃত্যু কোনো দুঃখের বিষয় নয়! প্রিয়জনের মৃত্যু সংবাদের সাথে বেদনা আচ্ছাদিত হওয়ার কারণ কিছুকালের মায়ার প্রভাব! মায়াতে জীবন, মায়াতে মৃত্যু! মায়া প্যারাডক্স! মানবাত্মা মৃত্যুর স্বাদ নিবে কিন্তু মরবে না! ‘আমি মৃন্ময়, আমি চিন্ময় আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়’।

সারওয়ার চৌধুরী

২৬ আগস্ট ২০১১

গদ্য রচনা

ইউএই

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন:

১টি মন্তব্য “মৃত্যুর স্বাদ নেবো কিন্তু মরবো না!”

  1. 1আগস্ট ২৯, ২০১১ @ ১১:৫৩ am
    ফিরোজ খান বলেছেন:
    সুন্দর, চিন্তাশীল, তথ্যশীল, গদ্যশীল,

    ভাল থাকুন, আলো আলো থাকুন, আমাদের চিন্তার খোরাক হউন।
    শুভ হোক পথ চলা।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে আগে লগইন করুন।

জলসাঘরে স্বাগতম!

প্রবেশ পথ

কুঞ্চিকা হারিয়েছে?

সদস্যপদের জন্য

কৃপা করে সারথির কাছে বার্তা প্রেরণ করুন: [email protected]